বাঙালির সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা এবং মানবিক ভাবধারার অপূর্ব প্রকাশভূমি হল শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলা। প্রতি বছর ৭ ই পৌষ শীতের চাদরে মুড়ে বিশ্বভারতী আশ্রম প্রাঙ্গণ যেন পরিণত হয় রং, সুর, শিল্প ও আনন্দের এক মহামিলন ক্ষেত্র রূপে। একশোরও বেশি বছরের ইতিহাসে গড়ে ওঠা এই মেলা আজ শুধু বাঙালির নয়—বিশ্বের সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষেরও গর্ব, উত্তেজনা ও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
ইতিহাসের শিকড়ে পৌষ মেলা
পৌষ মেলার শুরু হয়েছিল ১৮৯৪ সালে, যখন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আশ্রমে প্রচলিত ব্রাহ্ম-সমাজের ‘পৌষ-সংস্কার’ বা ‘ব্রহ্মসংস্কার’ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে একটি ছোট্ট মেলার আয়োজন করেন। প্রথম দিনে মেলার আকার ছিল সংক্ষিপ্ত—আশ্রমিক পরিবেশ, সরল ভোজ, ভোরের প্রার্থনা, ব্রহ্মসঙ্গীত এবং গ্ৰামবাসীদের কয়েকটি স্টল। কিন্তু মেলার মূল উদ্দেশ্য তখন থেকেই স্পষ্ট ছিল—মানুষে মানুষে মিলন, মানবধর্মের চর্চা এবং লোকসংস্কৃতির বিকাশ।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বভারতীর বিস্তার, রবীন্দ্র-চিন্তা, শিল্পচর্চা এবং আন্তর্জাতিক সংযোগের ফলে পৌষ মেলা ধীরে ধীরে একটি বৃহৎ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের রূপ নেয়। স্বাধীনতার পরে এই মেলা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকর্ষণ করতে শুরু করে; বীরভূমের সাধারণ মানুষ থেকে বিদেশের শিল্পী, গবেষক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী—সকলের মিলনস্থল হয়ে ওঠে শান্তিনিকেতন।
পৌষ মেলার শুরু : আধ্যাত্মিকতার অনুষঙ্গ
ভোরের প্রথম প্রহরে আশ্রমে অনুষ্ঠিত ‘ব্রহ্মসঙ্গীত’, কীর্তন, এবং প্রার্থনা—মেলাকে এক বিশুদ্ধ ও শান্তিকর পরিবেশ দিয়ে শুরু করে। নবীন-প্রবীণ আশ্রমিক, অধ্যাপক, ছাত্রছাত্রী, এবং আগত মানুষ একত্রে সূর্যোদয়ের আলোয় মানবধর্মের গান গেয়ে তোলেন।
লোকসংস্কৃতি ও শিল্পের বর্ণময় মহোৎসব
পৌষ মেলা আসলে বীরভূমের লোকজ আত্মার প্রতিচ্ছবি। বাউল-ফকিরদের আখড়া, একতারা-খমক-দোতারা’র সুর, শান্তিনিকেতনের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নৃত্যনাট্য, কবিগুরুর রচনার পরিবেশনা, চিত্রশিল্পের প্রদর্শনী—সব মিলিয়ে মেলাকে করে তোলে অত্যন্ত বহুমাত্রিক ও অনন্য।
এছাড়াও মেলার প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে থাকে—
চামড়ার কাজ, কাঁথা-সেলাই, বেতকাঠের শিল্প , কুমোরশিল্প, বালুচরি ও গ্রামীণ তাঁতের পোশাক, মাদুরজাত শিল্প, কাঠের খেলনা, মাটির পাত্র, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক হস্তশিল্প, শীতের পোশাক,বর্তমান মেলার সবকিছুই।
এই সব তৈরির পিছনে আছে বীরভূমের অসংখ্য শিল্পী-কারুশিল্পীর অক্লান্ত পরিশ্রম। তারা বছরের সবচেয়ে বেশি আয় করেন এই মেলাতেই। ফলে পৌষ মেলা স্থানীয় অর্থনীতিরও এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
মেলায় পর্যটকের ঢল
পৌষ মেলাকে ঘিরে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেন এই বোলপুর শান্তিনিকেতনে। দেশ-বিদেশের পর্যটকরা বহু আগে থেকেই সূচি নির্ধারণ করে রাখেন। আশ্রমের পরিবেশ, মেলার লোকজ সৌন্দর্য, রাস্তার দু’ধারে সাজানো স্টল, তাল-খেজুর গন্ধে ভরা শীতের বাতাস—সব মিলিয়ে মেলা যেন এক স্বপ্নের জগত।
মেলার সময় আশপাশের হোটেল, অতিথিশালা, ঘরোয়া হোমস্টে—সবই পূর্ণ হয়ে যায়। স্থানীয় পরিবহন, খাবার দোকান, টোটো ও রেন্ট সার্ভিস, ফটোগ্রাফার—সবাই লাভবান হন এই সময়ে। ফলে মেলা শুধুই সাংস্কৃতিক নয়; এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক উৎসব।
রবীন্দ্রদর্শন ও মানবধর্মের প্রতিফলন
পৌষ মেলা রবীন্দ্রনাথের সেই চেতনার প্রতিফলন, যেখানে মানুষে মানুষে সমান অধিকার, সৌন্দর্যচেতনা, সৃজনশীলতা ও শান্তির বার্তা রূপ পায়। এখানে ধর্ম নয়, মানবধর্মই মুখ্য। কোনো কোলাহল নয়, বরং সুর-সাধনা, শিল্পচর্চা ও সৎসম্পর্কের এক আবহ।
গুরুবাণীর সুরে গেয়ে ওঠে আশ্রমিকরা—
“যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক, আমি তোমায় ছাড়ি না।”
এই মন্ত্রেই যেন মেলার মূল মন্ত্রখানি লুকিয়ে আছে—বন্ধন নয়, মুক্তি; বিভাজন নয়, এ এক মিলন।
আজকের দিনে যখন পৃথিবীকে ছুঁয়ে গেছে আধুনিকতার দ্রুতগতি, তখনও শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলা তার প্রাচীন রূপ, আধ্যাত্মিক ভাবধারা এবং মানবিক মূল্যবোধকে ধরে রেখেছে। এটি শুধু একটি মেলা নয়—একটি ঐতিহ্য, একটি অনুভূতি, একটি জীবন্ত ইতিহাস।
বাউলের সুর, বেতের কাজ, কাঁথার নকশা, প্রার্থনার ধ্বনি, মানুষের হাসি—সব মিলিয়ে পৌষ মেলা আজও বাংলার সংস্কৃতি ও মননশীলতার এক উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে আছে