“কার্তিক সংক্রান্তির দিনে কল্যাণ করিয়া আড়াই মুঠা কাটিয়া লক্ষীপূজা হইয়া গিয়াছে…’
(‘গণদেবতা’ – তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়)
রাঢ় বঙ্গের কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায় গ্রাম-বাংলার এক প্রচলিত উজ্জ্বল ঐতিহ্যবাহী রীতির কথা এই সংলাপের মধ্যে তুলে ধরেছেন। তিনি এই সংলাপে কার্তিক সংক্রান্তির দিনে রাঢ় বাংলার লক্ষ্মী পূজোর বলেছেন। বর্তমান যুগে দাঁড়িয়ে কোনো কংক্রিটের শহরে বসে কিংবা বহুতল ফ্লাটের স্টাডি রুমে বসে তরুণ প্রজন্ম যখন উপন্যাসের এই লাইনটি পড়বে, তখন তাদের মনে এই লাইনের অর্থ বোঝার ইচ্ছে জাগতে পারে মনে।
ধান তো শুধু আমাদের আহার নয়, ধান আমাদের লোকায়তিক সংস্কৃতির ভিত্তিভূমি। গোলায় ধান ভরে উঠলে কৃষকের হাসি চওড়া হয়ে ওঠে। গ্রামবাংলায় একসময় অর্থনীতির পুরোটাই ধানকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হত। এখনো তার ব্যতিক্রম নয়। ‘নবীন ধান্যে হবে যে নবান্ন’। অঘ্রাণ মাস মানেই নবান্নের মাস। নতুন ধানের অন্ন হল এই নবান্ন। আষাঢ় শ্রাবণ মাসের বৃষ্টি শুরু হতেই কৃষকরা বুঝতে পারে এবার সময় এসেছে মাটিতে ধানের বীজ বপন করার। যদিও বর্তমানে বৃষ্টির জলের উপর কৃষকরা আর নির্ভর করে থাকে না। কৃষকরা এখন ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলন করে আগাম চাষ অবাদ শুরু করে দিয়েছে। চলে এসেছে আধুনিক যন্ত্রপাতি, নতুন নতুন পদ্ধতি। কিছুদিনের মধ্যেই দিক দিগন্ত বিদীর্ণ করে ধানের জমিগুলি সবুজ শ্যামলে ভরে ওঠে কানায় কানায়। কোজাগরির লক্ষ্মী পুজোর চাঁদের আলো সেই ধানক্ষেতের ডগা এসে লাগলেই সোনালী রঙ ধরে ধানের শিসে। কৃষকের চোখ তখন চকচক করে ওঠে। হেমন্তের হিমেল হাওয়া লাগতেই ধানের ক্ষেত সোনালি আভায় ভরে ওঠে । শুরু হয় ধান কাটার তোড়জোড়। তবে শুরুটা হয় নির্দিষ্ট প্রথা বা রীতি মেনে। রাঢ় বঙ্গে যুগ যুগ ধরে চলে আসা প্রচলিত একটি উৎসব হল মুঠ উৎসব। কার্তিক সংক্রান্তিতে কেন্দ্র করেই পালন করা হয় এই মুঠ পুজো বা মুঠ সংক্রান্তি। সংক্রান্তির তিথি অনুসারে এই মুঠ পুজো হলো রাঢ় বাংলার প্রথম লক্ষ্মীপুজো। প্রাচীন কৃষিভিত্তিক সমাজ কৃষিকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু ধর্মীয় উৎসব বা আচারকে যুক্ত করেছিল তার মধ্যে অন্যতম হলো এই মুঠ উৎসব। কৃষি দেবীর বন্দনা থেকেই মুঠ উৎসবের সূচনা। ‘মাগো তোমার কৃপা পায়’ – শ্রমজীবী মানুষের কাছে এ এক ধরণীর নজরানা – লক্ষ্মীকে ঘরে তোলার দিন। তাদের বাসনা আমার সন্তান যেনো থাকে দুধে ভাতে। কার্তিক সংক্রান্তিতে কোথাও আবার অঘ্রাণ মাসের প্রথম দিনে গাঁয়ের মানুষেরা বিশেষ করে কৃষকরা প্রত্যেকে নিজ নিজ ক্ষেত থেকে আড়াই মুঠা করে ধান কেটে এনে সেই ধানের সমষ্টি বাড়ির পবিত্রস্থানে রেখে লক্ষীরূপে পুজো করে। কৃষকদের কাছে এ এক অদ্ভুত সংস্কৃতি, অদ্ভুত বিশ্বাস। ক্ষেতের সোনালি ধান খামারের গোলায় তোলার আগে যাতে কোনভাবে বিপত্তি না আসে সেইজন্য প্রথমেই মা- লক্ষ্মীর পুজো শ্রদ্ধাভরে পালন করে কৃষকরা। কার্তিকের শেষ দিনের প্রথম সকাল- ভোরের কুয়াশায় ভিজে থাকে সোনালী মাঠ-ঘাট। গায়ে এসে লাগে হেমন্তের হিমেল হাওয়া। আলো ফুটলেই কৃষকের ঘরে ঘরে শুরু হয়ে যায় মুঠপুজোর আয়োজন। সকাল সকাল স্নান সেরে কৃষকেরা পবিত্র সাদা পোশাক পরে হাতের কাস্তে নিয়ে চলে যায় নিজ নিজ সোনালী ক্ষেতে। তারপর ক্ষেতের এক কোণে আড়াই মুঠা ধান কেটে, ভক্তিভরে প্রণাম করে, সেই ধানের সমষ্টিকে মাথায় তুলে, বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে পা বাড়ায় । মাঠ থেকে বাড়ি পর্যন্ত ফেরার সময় কোন কথা বলে না তারা। এটাই রীতি, এটাই নিয়ম – মা যেনো কোনো ভাবে রুষ্ট না হন। নিজের বাড়ির দরজায় এসে দাঁড়ালেই কৃষকের স্ত্রী অর্থাৎ বাড়ির গৃহবধূরা একটা কাঠের পিড়েতে তাদের দাঁড় করায়, তারপর মাটির মঙ্গলঘটের জল দিয়ে কৃষকের পা ধুইয়ে, নিজের কাপড়ের আঁচল দিয়ে মুছিয়ে দেয় কৃষকের পা। তারপর সেই গৃহবধূ ভক্তিভরে প্রণাম সেরে, মা লক্ষ্মীকে সাদরে আহ্বান জানায় নিজের ঘরে। সেই ধানের সমষ্টিকে বাড়ির পবিত্র স্থানে রেখে পুজো করা হয়।
কালের নিয়মে একদিন হয়ত এই প্রথার বা রীতি – রেওয়াজ, সম্পূর্ণই হারিয়ে যাবে। আগামী প্রজন্ম হয়তো এই রীতি সম্পর্কে জানতেই পারবে না৷ তবুও নতুন সেই প্রজন্ম তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘গণদেবতা’র এই লাইনটুকু পড়ে ইচ্ছে জাগবে এর অন্তর্নিহিত অর্থ জানার। হরিয়ে গেলেও এই প্রথা এইভাবে জীবিত থাকবে।
ড. সুদীপ মুখার্জি (চণ্ডিদাসপুর, বীরভূম)