পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্কুলে মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা: প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবতা

একটি বিশেষ প্রতিবেদন : বর্তমান সময়ে শিক্ষার পরিধি শুধু পাঠ্যবই, পরীক্ষা বা নম্বরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক পরিবর্তন, প্রযুক্তির প্রভাব, পারিবারিক চাপ এবং প্রতিযোগিতার জগতে আজকের স্কুলপড়ুয়া শিশুদের মানসিক অবস্থার ওপর যে অদৃশ্য চাপ বাড়ছে, তা ক্রমেই উদ্বেগজনক। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশের জন্য যেমন শারীরিক স্বাস্থ্য জরুরি, তেমনই সমান গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্য। এই প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্কুলগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আজ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

কেন মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা জরুরি?

গবেষণায় দেখা যায়, কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, পরীক্ষার চাপ, পারিবারিক অশান্তি, সাইবার বুলিং, একাকীত্ব—এই সমস্যাগুলি দ্রুত বাড়ছে। স্কুলশিক্ষকরা চাইলেও সব সময় শিশুদের অন্তর্নিহিত সমস্যাগুলি বুঝতে পারেন না।

মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা শুরু হলে—

শিক্ষার্থীরা নিজেদের অনুভূতি বুঝতে ও প্রকাশ করতে শিখবে,

চাপ মোকাবিলার কৌশল জানতে পারবে,

আত্মবিশ্বাস বাড়বে,

সহপাঠীদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও মজবুত হবে,

বুলিং, হিংসা ও অবসাদজনিত সমস্যার হার কমবে।

সরকারি উদ্যোগের চিত্র

রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই বিভিন্ন স্কুলে ‘স্টুডেন্ট হেল্প ডেস্ক’, ‘পরামর্শদান শিবির’, “মানসিক স্বাস্থ্য দিবস” পালনসহ পর্যায়ক্রমিক কর্মশালা চালু করেছে। কিছু জেলায় বিশেষজ্ঞ মনোবিজ্ঞানীদের নিয়ে সেমিনারও হচ্ছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রচেষ্টা প্রশংসনীয় হলেও এখনো তা পর্যাপ্ত নয়। অধিকাংশ স্কুলে স্থায়ী কাউন্সেলর নেই, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ সীমিত, এবং অভিভাবকদের সচেতনতার অভাবও এক বড় বাধা।

মাঠের বাস্তবতা—স্কুলের অভিজ্ঞতা

কলকাতা, হাওড়া, বীরভূম, উত্তর ২৪ পরগনা—বিভিন্ন জেলার বেশ কিছু সরকারি স্কুলে শিক্ষকরা জানিয়েছেন,

ছাত্রছাত্রীরা পরীক্ষার সময় প্রবল মানসিক চাপের মধ্যে থাকে,

সামাজিক মাধ্যমে আসক্তি থেকে ঘুমের সমস্যা ও মনোযোগের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে,

অনেক শিশু পারিবারিক সহিংসতা বা অশান্ত পরিবেশের প্রভাব স্কুলেও বহন করে আনছে,

বিশেষ প্রয়োজনবিশিষ্ট শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত পরিকাঠামো নেই।

এই সমস্যাগুলি মোকাবিলার জন্য একটি সুসংবদ্ধ মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা কার্যক্রম প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে।

শিক্ষক-অভিভাবকের ভূমিকা

মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষাকে সফল করতে তিনটি স্তম্ভ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—শিক্ষক, অভিভাবক এবং স্কুল প্রশাসন।

শিক্ষকদের প্রাথমিক মনোবিজ্ঞানের প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার।

অভিভাবকদের সচেতন করতে স্কুলে নিয়মিত মিটিং, আলোচনা সভা ও পরামর্শ শিবির করা জরুরি।

স্কুল প্রশাসনকে উচিত স্থায়ী কাউন্সেলর নিয়োগ এবং নিরাপদ, সহানুভূতিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করা।

ভবিষ্যতের পথ

শিক্ষাবিদদের মতে, মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা একদিনের প্রকল্প নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। পাঠ্যক্রমে ‘লাইফ স্কিল এডুকেশন’, ‘ইমোশনাল লার্নিং’, ‘স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট’ অন্তর্ভুক্ত করলে শিক্ষার্থীরা আরও সক্ষম হয়ে উঠবে। পাশাপাশি, প্রতিটি ব্লকে অন্তত একজন প্রশিক্ষিত স্কুল কাউন্সেলর নিয়োগ করা হলে সরকারি স্কুলগুলিতে একটি বড় পরিবর্তন আসবে।

মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা মানে শুধু সমস্যাগ্রস্ত শিশুদের চিকিৎসা নয়—বরং প্রতিটি শিক্ষার্থীকে শক্তিশালী, সহানুভূতিশীল এবং মানসিকভাবে স্থিতিশীল করে তোলা। পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্কুলে এই শিক্ষার প্রবর্তন এখন সময়ের দাবি। কারণ সুস্থ মনই গড়ে তোলে সুস্থ প্রজন্ম—আর সেই প্রজন্মই তৈরি করবে আরও মানবিক, আরও সমৃদ্ধ আগামীকাল।

Leave a Comment