অগ্রহায়ণের শেষ দিন—ধান কাটার কাজ প্রায় শেষ, গোলা ভরার আনন্দ ঘরে ঘরে। এই বিশেষ দিনে গ্রামবাংলায় মেয়েরা পালন করেন ইতু লক্ষ্মী ব্রত। বিশ্বাস করা হয়, এই দিনে ইতু লক্ষ্মীর পুজো করলে সংসারে অভাব আসে না, ধানঘর ভরে থাকে, সন্তান-সন্ততি সুস্থ থাকে।
ভোর হওয়ার আগেই মেয়েরা স্নান সেরে শুদ্ধ বস্ত্র পরে উঠোন পরিষ্কার করেন। চালের গুঁড়োয় আঁকা হয় সুন্দর আলপনা—ধানশিষ, পদ্মফুল, সূর্যচিহ্ন, পায়ের ছাপ। উঠোনের এক কোণে বা রান্নাঘরের কাছে একটি ছোট ঘট বসিয়ে তাতেই প্রতিষ্ঠা করা হয় ইতু লক্ষ্মীর প্রতীক। কারণ লক্ষ্মী দেবী সংসার ও অন্নের অধিষ্ঠাত্রী।
ইতু লক্ষ্মীর পুজোর প্রধান বৈশিষ্ট্য তার সরলতা। এখানে আগুনে রান্না করা ভোগ নেই। দেওয়া হয় চিঁড়ে, দই, কলা, গুড়, নারকেল, মৌসুমি ফল, দূর্বা ও আমপাতা। এই কাঁচা উপাচারেই দেবী প্রসন্ন হন—এমনটাই লোকবিশ্বাস।
পুজোর সময় মেয়েরা একসঙ্গে বসে ইতু লক্ষ্মীর ব্রতকথা পাঠ করেন। সেই কথায় উঠে আসে দরিদ্র ঘরের কষ্ট, ধৈর্য, সততা আর লক্ষ্মীর কৃপায় সুখ ফিরে পাওয়ার গল্প। কখনও ছড়া, কখনও লোকগানের সুরে বলা হয়—
“রাত পোহালে ইতু লক্ষ্মী,
ঘরে ঘরে ভরে উঠুক ধান আর সুখ।”
এই ব্রত আসলে নারীর হাতে গড়া এক লোকজ সাধনা। পুরুষের আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ নেই; সংসারের মঙ্গলকামনায় মেয়েরাই এখানে প্রধান। অগ্রহায়ণের শেষ দিনে ইতু লক্ষ্মী পুজো তাই শুধুই ধর্মীয় আচার নয়—এ হল কৃষিজীবন, নারীসমাজ ও বাংলার লোকসংস্কৃতির এক আন্তরিক মিলন।
আজ অনেক জায়গায় এই ব্রত হারিয়ে যেতে বসেছে। তবু গ্রামবাংলার কোথাও কোথাও অগ্রহায়ণের শেষ ভোরে এখনও আলপনায় লেখা থাকে বিশ্বাসের ভাষা—
ইতু লক্ষ্মী এলে, অভাব যায় দূরে।