মেলা—শব্দটার মধ্যেই লুকিয়ে আছে মিলনের সুর। মানুষে-মানুষে দেখা, হাসি, গল্প, বিশ্বাস আর আনন্দের আদান–প্রদান। মেলা মানেই উৎসবের আবহ, রঙিন ভিড়, আর একটু আলাদা হয়ে যাওয়া দৈনন্দিন জীবনের ছন্দ থেকে। বাংলার গ্রামজীবনে এই মেলা শুধু বিনোদন নয়—এ এক সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক মিলনক্ষেত্র। ঠিক তেমনই এক অনন্য মিলনভূমি পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়া মহকুমার অন্তর্গত কেতুগ্রাম–১ ব্লকের দধিয়া বৈরাগ্যতলা মেলা।

অবিভক্ত বর্ধমান জেলা তো বটেই, অনেকের মতে সমগ্র বাংলার প্রেক্ষিতেই এই মেলা রাজ্যের সর্ববৃহৎ অন্নমহোৎসব বা অন্নসত্র ক্ষেত্র। এখানে অন্ন কেবল খাদ্য নয়—এ এক দর্শন, এক সামাজিক বন্ধন।
দধিয়া বৈরাগ্যতলা মেলার উৎপত্তিকাল সম্পর্কে নির্দিষ্ট ও একক তথ্য মেলে না। বিভিন্ন গবেষক, পত্র-পত্রিকা ও লোককথায় নানা সাল ও তারিখের উল্লেখ থাকলেও একটি বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই—বৈষ্ণব সাধক গোপালদাস বাবাজীর প্রবর্তিত এই মেলা প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে।

কিংবদন্তি ও লোকস্মৃতির সূত্র ধরে জানা যায়, একাদশ বঙ্গাব্দের শেষভাগে উত্তর ভারতের কনৌজ বংশে জন্ম নেওয়া গোপালদাস বাল্যকালেই সংসার ত্যাগ করে বৈরাগ্যের পথ বেছে নেন। ঝুলিতে একমাত্র সম্বল রঘুনাথজীর বিগ্রহ নিয়ে তিনি বৃন্দাবন, প্রয়াগ, গয়া ঘুরে বাংলায় প্রবেশ করেন। নবদ্বীপ, কাটোয়া, শ্রীখণ্ড, নানুর, ঝামটপুর—এইসব অঞ্চল ঘুরে শেষ পর্যন্ত তিনি দধিয়া অঞ্চলে এসে উপস্থিত হন।

আজকের বৈরাগ্যতলার জায়গাটি একসময় ছিল নির্জন—সাঁওতা নামের এক বিশাল দিঘি, তার পূর্ব পাড়ে ঘন আমবাগান, যেখানে সূর্যালোকও প্রবেশ করতে পারত না। সেই পবিত্র নির্জনতাতেই বৈষ্ণব সাধকদের সমাধিস্থল গড়ে উঠেছিল।
লোককথা অনুযায়ী, ১০৯৬ বঙ্গাব্দ নাগাদ নিত্যানন্দ পরম্পরার এক সাধক বৈরাগীদাস এখানে শালগ্রাম শিলা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর তিরোধানের পর গোপালদাস বাবাজী এই আখড়ার দায়িত্ব নেন এবং রঘুনাথজী বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। বর্ধমানের তৎকালীন মহারাজা তিলকচাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠে পঞ্চরত্ন পাকা মন্দির।

মাঘ মাসের মাকরী সপ্তমীতে মন্দিরে রঘুনাথজীর পুনঃপ্রতিষ্ঠা উপলক্ষে শুরু হয়েছিল ছোটখাটো গ্রাম্য মেলা। কালক্রমে সেই মেলাই আজকের বিশাল দধিয়া বৈরাগ্যতলা মেলা।
এই মেলার প্রাণ হলো অন্নকূট বা অন্নসত্র। প্রাচীন রীতি মেনে আশপাশের গ্রাম থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে চাল, ডাল, সবজি, কাঠ নিয়ে আসেন স্বেচ্ছাসেবকেরা। গড়ে ওঠে প্রায় ৫০০টি আখড়া। প্রথম তিন দিন লক্ষাধিক মানুষকে বিনামূল্যে আহার করানো হয়—এমন নজির বাংলায় বিরল।
মাকরী সপ্তমীর দিন চিঁড়ে-বাতাসার ভোগ, পরদিন অন্নকূট, তার পরের দিন হরিনাম সংকীর্তন ও ধূলোট উৎসব—ধর্ম, আনন্দ ও মানবিকতার অপূর্ব সহাবস্থান।
অন্নের পাশাপাশি দধিয়া বৈরাগ্যতলা মেলা এক পূর্ণাঙ্গ গ্রাম্য মেলা। সারি সারি দোকানে কাঁসা-পিতলের বাসন, শিল-নোড়া, কৃষিযন্ত্র, মাটির পুতুল, খেলনা, পোশাক, খাবার—সবই আছে। নাগরদোলা, ম্যাজিক শো, লোকগান, বাউলদের আসর মেলায় এনে দেয় আলাদা প্রাণ।

এক সময় প্রবাদ ছিল—
“সিজোনো খেয়ে উঠল ঢেউ, বরগিতলা যাবি কেউ?”
আজ সেই পথ হাঁটা বদলে গাড়ি, বাস, অটো হলেও মানুষের উৎসাহ একই রকম অটুট।
এই মেলার সবচেয়ে বড় পরিচয়—এটি মানুষের মেলা। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হিন্দু-মুসলমান, সাধু-সন্ত, বাউল, বৈরাগী—সকলের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে দধিয়া বৈরাগ্যতলা সত্যিকারের মিলনক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
প্রায় ৩০০ বছরের বেশি পুরোনো এই মেলায় আজ লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়। দর্শনার্থীর সংখ্যায় এটি বীরভূমের জয়দেব মেলার সঙ্গেও তুলনীয়।
দধিয়া বৈরাগ্যতলা মেলা শুধু একটি উৎসব নয়—এ এক চলমান ইতিহাস। অন্ন, আনন্দ ও আধ্যাত্মিকতার যে সেতুবন্ধন এই মেলা গড়ে তুলেছে, তা আজকের সময়ে আরও প্রাসঙ্গিক। গোপালদাস বাবাজীর বৈরাগ্য থেকে জন্ম নেওয়া এই উৎসব আজ সর্বজনীন—মানুষের মিলনে, মানবিকতায় ও বিশ্বাসে।
দধিয়া বৈরাগ্যতলা—যেখানে অন্নই উৎসব, আর মানুষই আসল সম্পদ।
✍️ ড. সুদীপ মুখার্জী