স্মরণে মদনমোহন তর্কালঙ্কার – মদনমোহন তর্কালঙ্কারের জন্মদিনে নিবেদিত

মনে পড়ে যায় ছোটবেলায় পড়া সেই কবিতাটির কথা …

পাখী-সব করে রব, রাতি পোহাইল।

কাননে কুসুমকলি, সকলি ফুটিল।।

রাখাল গরুর পাল, ল’য়ে যায় মাঠে।

শিশুগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে।।

উনিশ শতক বঙ্গ সাহিত্য ও সমাজ বিকাশ ভাবনার আলোকে নব প্রভাতের সূত্রপাত। বাংলার তমসাচ্ছন্ন যুগের অবসান ঘটিয়ে অশিক্ষা, কুসংস্কার, বাল্যবিবাহ, সতীদাহ প্রথা, স্ত্রীশিক্ষা, বিধবা বিবাহ‌ প্রভৃতি সামাজিক অবক্ষয় কাটিয়ে বাংলার তখন এক নবযুগের সূচনা হলো। সেই সময় বঙ্গের প্রতিটি প্রভাতে লাগল রক্তিম ছটা, যেন ‘হঠাৎ বসন্ত’। উনিশ শতকের নবজাগরণের চেতনাকে বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যে বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি ও সমাজ বিকাশের ক্ষেত্রে যে সব মনীষী বিশ্ববরেণ্য করে তুলেছিলেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিষ্টি সুরের ‘প্রভাতবর্ণন’এর কবি মদনমোহন তর্কালঙ্কার। মাত্র ৪১ বছরের জীবনে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য সৃষ্টি ও সামাজিক কাজ করেছেন যার জন্য তিনি স্মরণীয়, শ্রদ্ধেয় প্রতিটি বাঙালির মনে ও মননে। তবে যতটা শ্রদ্ধা, গ্রহণযোগ্যতা, স্মরণযোগ্যতা তাঁর প্রাপ্য ছিল ঠিক ততটা কী তিনি পেয়েছেন? স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের হাতেখড়ি তাঁর শিশুপাঠ্য বই ‘শিশুশিক্ষা’ পড়ে। উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকে বর্তমান পর্যন্ত জন্ম নেওয়া প্রতিটি বাঙালি শিশুর কাছে ‘শিশুশিক্ষার’ কবিতাগুলি মুখে মুখে উচ্চারিত। কিন্তু প্রকৃত কবিকে আজও অনেক বাঙালি মনে করতে পারেন না। জন্মের দুশো বছর পার করেছেন ২০১৬ সালে তবুও কোথাও যেন আজও উপেক্ষিত এই কবি ও সমাজ সংস্কারক মদনমোহন তর্কালঙ্কার ।

নদীয়া জেলার দুই প্রাণের শহর নবদ্বীপ ও কৃষ্ণনগরের কাছে নাকাশিপাড়ার অন্তর্গত বর্ধিষ্ণু বিল্বগ্রাম। এই গ্রামে ১৮১৭ সালের ৩ জানুআরি কবি মদনমোহন চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম। নবন্যায় সংস্কৃতবিদ গ্রামের সবচেয়ে প্রাচীন ব্রাহ্মণ বিষ্ণুদাসের বংশধর মদনমোহন। পিতা রামধন চট্টোপাধ্যায় সেই যুগে ঐ অখ্যাত গ্রাম থেকে কলকাতার সংস্কৃত কলেজের লিপিকর ছিলেন। মাত্র ১২ বছর বয়সে গ্রামের পাঠশালার সংকীর্ণ গণ্ডি ছেড়ে মদনমোহন পাড়ি দিয়েছিলেন নবজাগরণের পীঠস্থান কলকাতায়। ভর্তি হলেন সংস্কৃত কলেজে। সেই সময় মহানগর কলকাতা নবজাগরণের আলোক স্পর্শে প্রজ্বলিত। সেই আলোর ছটায় মাত্র ৯ বছর বয়সে মেদিনীপুরের সিংহশিশু ঈশ্বরচন্দ্রের ও আবির্ভাব। ঈশ্বরচন্দ্র, মদনমোহনের থেকে তিন বছরের ছোটো হলেও একই সঙ্গে শুরু হলো তাঁদের সংস্কৃত কলেজে পাঠগ্রহণ পর্ব। ক্রমে ক্রমে দুই বন্ধু মদনমোহন ও ইশ্বরচন্দ্র নিজেদের মধ্যে আসক্ত হয়ে পড়লেন কলকাতার নবজাগরণের বাতাসে। মেধা বা বুদ্ধিতে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও উভয় উভয়ের জন্য ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। ব্যাকরণ, সাহিত্য, অলংকার শাস্ত্র শেষ করে দুজনে জর্জ পণ্ডিতের ডিগ্রি লাভ করলেন। খুব অল্প বয়সে মেধা, কবিত্বশক্তি ও গভীর পাণ্ডিত্যের জন্য মদনমোহন পেয়েছিলেন ‘কবিরত্নাকর’ ও ‘তর্কালঙ্কার’ উপাধি। কৈশোর বয়সে মদনমোহন লিখলেন দুটি কাব্য — ‘রসতরঙ্গিনী’ (১৮৩৪), ‘বাসবদত্তা’ (১৮৩৬)। সেই সময় গদ্য লেখার প্রচলন… কিন্তু মদনমোহন হাঁটলেন উল্টো পথে — কাব্যের তরী নিয়ে। মদনমোহনের কাব্য প্রতিভা ও কবিতার প্রসঙ্গে দ্বারকানাথ অধিকারী বলেছেন — “সুকবি সুন্দর মম মদনমোহন / পড়িলে কবিতা তার মুগ্ধ হয় মন।” ভারতচন্দ্রের কাব্যরীতির মোহ ও আদি রসের কাব্য বলে অনেকে কাব্য দুটিকে গুরুত্ব দিতে না চাইলে,অনেক সমালোচক আবার ভাব-ভাষা, আঙ্গিক, ছন্দ ও অলংকার প্রসঙ্গে এই দুটি কাব্যকে যুগান্তকারী বলে স্বীকার করেছেন।

পাঠশেষে ১৮৪২ সালে জানুআরি মাসে হিন্দু কলেজ পাঠশালার (কলিকাতা বঙ্গ বিদ্যালয়) শিক্ষকতার দায়ভার গ্রহণ করেন মদনমোহন। পরে বারাসত সরকারি বিদ্যালয়ের প্রধান পন্ডিত এর দায়িত্ব পালন করেন কিছুদিন। এরপর আবার অভিন্ন হৃদয় দুই বন্ধু কাছাকাছি। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিত হিসেবে মদনমোহনের প্রবেশ ১৮৪৩ সালের এপ্রিল মাসে। সেখানে শুধু বাঙালি ছাত্ররা নয়, ইংরেজ সিভিলিয়ানরাও তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ভক্তি চোখে দেখতেন। মদনমোহনকে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে পণ্ডিত হিসেবে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে ঈশ্বরচন্দ্রের বড় ভূমিকা ছিল। ১৮৪৬ কৃষ্ণনগর সরকারি কলেজের অধ্যাপকরূপে নিযুক্ত হলেন মদনমোহন। বন্ধু ঈশ্বরচন্দ্রের টানে মদনমোহন আবার কলকাতার সংস্কৃত কলেজে জয়গোপাল তর্কালঙ্কারের পদাভিষিক্ত হলেন সাহিত্যের অধ্যাপকরূপে। তাঁরা দুজনেই সংস্কৃত কলেজে পড়বার ও পড়াবার সুযোগ পেলেন।

মদনমোহন ১৮৫০ সাল পর্যন্ত কলকাতায় থাকার সুবাদে ঈশ্বরচন্দ্রের পৃষ্ঠপোষকতায় শিক্ষা ও সমাজের কাজে ব্রতী হয়েছিলেন। আসলে মদনমোহন তর্কালঙ্কার ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্রের প্রকৃত সঙ্গী। ১৮৪৭ সালের জুলাই মাসে তাঁদের উদ্যোগে তৈরি হলো ‘সংস্কৃত যন্ত্র’ নামক ছাপাখানা। দুজনে এই ছাপাখানার সমান অংশীদার। সংস্কৃত যন্ত্র নামক প্রেস থেকে অনেক গ্রন্থ সম্পাদিত হলো। উল্লেখ্য — ‘অন্নদামঙ্গল’, ‘দশকুমার চরিত’, ‘কাদম্বরীর’ মতো জনপ্রিয় কাব্য। সমাজের অন্ধ বিশ্বাস ও কুসংস্কারের হাত থেকে সমাজকে মুক্ত করতে তখন দুই বন্ধুর সম্পর্ক আরো গাঢ় হলো।

সেই সময় বেথুন সাহেব এলেন কলকাতায় মেয়েদের স্কুল খোলার স্বপ্ন নিয়ে। বেথুন সাহেবের এই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করতে প্রয়োজন ছিল একজন যুক্তিবাদী প্রগতিশীল বিশ্বস্ত সহযোগীর — এগিয়ে এলেন মদনমোহন। দেহমন সমর্পণ করে বেথুনের প্রয়াসকে সফল করলেন। বিনা বেতনে বেথুনের মহিলা স্কুলে শিক্ষকতা করলেন। সমাজের ভ্রুকুটি এড়িয়ে ভর্তি করলেন তাঁর দুই মেয়ে ভুবনমালা আর কুন্দমালাকে। তাঁর এই কর্মকাণ্ডে অনেকেই অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন সেইসময় বিশেষ করে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি। বেথুনের অনুরোধে লিখলেন মেয়ে ও শিশুদের জন্য ‘শিশুশিক্ষা’র মতো প্রাইমার তিনটি খণ্ডে। প্রথম দুটি খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৮৪৯ সালে আর তৃতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৯৫০ সালে। বাংলা প্রাইমারের ক্ষেত্রে ‘শিশুশিক্ষা’ আধুনিক ধারার সূত্রপাত। শিশুশিক্ষার ছয় বছর পর ঈশ্বরচন্দ্রের ‘বর্ণপরিচয়’ আর বর্ণপরিচয়ের ৭৫ বছর পর, রবীন্দ্রনাথের ‘সহজ পাঠে’র কোথাও কোথাও মদনমোহনের ছায়া প্রকট।

‘প্রভাত বর্ণনের’ কবিতাটি খণ্ড ‘পাখী সব করে রব’ কবিতাটি আজও বঙ্গ সমাজে মুখে মুখে উচ্চারিত ঠিক শিশু শ্রেণিতে নামতা পড়ার মতো। ‘শিশুশিক্ষার’ অনেক অংশ জুড়ে আছে মূল্যবোধ ও শান্তি শিক্ষার বাণী যা নিয়ে আজও বিশ্ব চিন্তিত। ১৮৫০এর আগস্ট মাসে ‘সর্বশুভাকরী’ পত্রিকা আত্মপ্রকাশ করলে মদনমোহন লিখলেন ‘স্ত্রী শিক্ষা’ নামক প্রবন্ধ। এই প্রবন্ধ সেকালে ঝড় তুলেছিল সমাজে। মদনমোহন সেই সময়েই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন সমগ্র সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে স্ত্রীশিক্ষার উন্নতি প্রয়োজন। নারী শিক্ষার পথ চলায় এ প্রবন্ধ নতুন প্রভাতের আলো । ১৮৫০ সালের নভেম্বর মাসে মদনমোহন কিছুটা পারিশ্রমিক ও সম্মানের সুযোগ পেয়ে জজ পণ্ডিত হয়ে পাড়ি দিলেন মুর্শিদাবাদে। ততদিনে প্রাণের বন্ধু ঈশ্বরচন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্কে কিছুটা চিড় ধরেছে। মুর্শিদাবাদে এসে শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব ভার নয় শিক্ষা বিস্তারে স্বতঃস্ফূর্ত ভূমিকা নিলেন। বেথুন সাহেবও চেয়েছিলেন যে বন্ধু মদনমোহন এই পিছিয়ে পড়া জেলার শিক্ষাবিস্তারে বড় ভূমিকা পালন করুন। মুর্শিদাবাদে বহরমপুর কলেজ (বর্তমানে কৃষ্ণনাথ কলেজ) প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর বড় ভূমিকা ছিল। তাছাড়া মুর্শিদাবাদে বালিকা বিদ্যালয়, ইংরেজি বিদ্যালয়, দাতব্য চিকিৎসালয়, অতিথিশালা, রাস্তাঘাট নির্মাণ নানা জনহিতকর কাজে নিজেকে সমর্পন করলেন মদনমোহন। সেই সময় বহু বিতর্কিত বিষয় ‘বিধবা বিবাহ’ বাস্তবায়নে হাত মিলিয়েছিলেন বন্ধু ঈশ্বরচন্দ্রের সঙ্গে। মদনমোহনের মধ্যস্থতায় পরিচিত শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্নের সঙ্গে বিবাহ হলো ব্রহ্মবান্ধব মুখোপাধ্যায়ের বিধবা কন্যা কালিমতির। ১৮৫৬ সালের ৫ আগস্ট ঘটলো বঙ্গের প্রথম বিধবা বিবাহ আর সংযোজন কর্তা মদনমোহন তর্কালঙ্কার। শুধু তাই নয়, বিধবা বিবাহের সমর্থনে গণ স্বাক্ষরের প্রথম স্বাক্ষরটি মদনমোহনের। ১৮৫৭ সালের জানুআরি মাসে মদনমোহনকে কান্দীর ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট করা হলো। বঙ্গদেশের একেবারে পিছিয়ে পড়া মহকুমাকে আলোয় আনার সন্ধানে নামলেন তিনি। অল্পদিনের মধ্যে সেখানকার জনগণের নয়নের মণি হয়ে উঠলেন। প্রশাসনিক দায়ভার ও সমাজ সংস্কার সমান্তরাল ভাবে চলতে থাকল। সেই সময় কান্দীর সন্নিকটে মাকালতোড় নামক গ্রামে চলত নকল যুদ্ধ। প্রাণ যেত বহু নিরীহ মানুষের। শান্তির বার্তা বাহক মদনমোহন দুই মুসলমান জমিদারের বার্ষিক এই নকল ও নিষ্ঠুর খেলা মেনে নিতে পারেন নি। অমানবিক যুদ্ধ বন্ধ করতে নিজে গেলেন মাকালতোড় গ্রামে। জমিদারদের লেঠেলের আঘাতে জ্ঞান হারালেন মদনমোহন। কিন্তু যুদ্ধ বন্ধ করেছিলেন। অর্ধমৃত মানুষটি তার কিছুদিন পরে ১৮৫৮ সালের ৯ মার্চ দুশ্চিকিৎস‍্য বিসূচিকা (ওলাওঠা) রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন। মাত্র ৪১ বছর বয়সে হারিয়ে গেলেন উনিশ শতকের নবজাগরণের পথিকৃৎ, সমাজ সংস্কারক, সুদক্ষপ্রশাসক, স্ত্রীশিক্ষার কাণ্ডারী, ‘প্রভাত বর্ণন’ ও ‘শিশুশিক্ষা’র সেই মিষ্টি সুরের কবি। বন্ধুর অকাল মৃত্যুতে তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র — সে প্রমাণ মেলে । এই মহাত্মা কবি ‘শিশুশিক্ষার’ প্রণেতা ময়ূরাক্ষীর তীরে আজ ও চির নিদ্রায়। সকল গুণের অধিকারী হয়েও শুধু প্রচার ও প্রসারের আলো না পেয়ে মদনমোহন তর্কালঙ্কার থেকে গেলেন বাংলার আপামর জনসাধারণের অগোচরে। শুধুমাত্র তাঁর জন্মস্থান বিল্বগ্রামে মদনমোহন স্মৃতিরক্ষা কমিটি ও কিছু সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে তাঁর জন্মদিনটি পালন করা হয়। কিন্তু বিশ্ববরেণ্য এই মানুষটির প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধার অভাব এখনো বর্তমান। সেই দায়ভার শুধু মদনমোহন স্মৃতিরক্ষা কমিটি বা সরকারের নয় আপামর বিশ্ববাঙালির। শুধুমাত্র গোলাপি মলাটে ‘শিশুশিক্ষা’ই নয় মদনমোহন বেঁচে থাকুন বিশ্ববরেণ্য হয়ে। মদনমোহন তর্কালঙ্কার সম্পর্কে আচার্য কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্যের স্মৃতিচারণটি তাই খুব প্রাসঙ্গিক —

“তিনি যদি ডেপুটিগিরি চাকরী করিতে না গিয়া বাঙ্গালী সাহিত্য সেবায় রত থাকিতেন, তাহা হইলে এক্ষণে আমরা যে প্রশংসা পুষ্পাঞ্জলি কেবল বিদ্যাসাগরের চরণে অর্পণ করিতেছি, তাহা অর্ধেক ভাগ করিয়া দুই জনকে দিতে হইত।”

Leave a Comment