বীরভূম জেলার নানুর—বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক পবিত্র নাম। এই নানুরই বহন করে চলে মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি চণ্ডীদাস ও তাঁর প্রেমিকা রামীর অমর স্মৃতি। প্রেম, ভক্তি ও মানবতাবাদের যে যুগান্তকারী মেলবন্ধন চণ্ডীদাসের কাব্যে ফুটে উঠেছিল, তার শিকড় আজও ছড়িয়ে আছে নানুরের মাটি ও মানুষের মনে।
নানুর: বৈষ্ণব সাধনার পীঠস্থান
নানুর শুধু একটি গ্রাম নয়, এটি বৈষ্ণব আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ তীর্থভূমি। ঐতিহাসিক মত অনুযায়ী, এই নানুরেই জন্ম ও কর্মসূত্রে যুক্ত ছিলেন কবি চণ্ডীদাস। শ্রীকৃষ্ণভক্তি, রাধাভাবনা ও মানবপ্রেমের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা তাঁর পদাবলি বাংলা সাহিত্যে এক নতুন ধারার সূচনা করে।
রামী: সমাজের চোখে নিষিদ্ধ, সাহিত্যে চিরঅমর
রামী ছিলেন চণ্ডীদাসের জীবনের অনুপ্রেরণা। সমাজের প্রচলিত নিয়ম ও জাতপাতের বেড়াজালে তাঁদের প্রেম ছিল তথাকথিত ‘অপরাধ’। কিন্তু সেই নিষিদ্ধ প্রেমই চণ্ডীদাসের কলমে রূপ নেয় গভীর মানবিক দর্শনে। রামী কোনো পৌরাণিক চরিত্র নন—তিনি বাস্তব মানুষ, যাঁর যন্ত্রণা, প্রেম ও আত্মত্যাগ বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
“সবার উপরে মানুষ সত্য”—চণ্ডীদাসের দর্শন
চণ্ডীদাসের কাব্যের মূল সুর মানবতাবাদ। তাঁর অমর বাণী—
“সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই”
আজও প্রাসঙ্গিক। রামী-চণ্ডীদাসের প্রেম কেবল ব্যক্তিগত আবেগ নয়, তা ছিল সমাজ সংস্কারের এক নীরব প্রতিবাদ।
নানুরে স্মৃতি ও উত্তরাধিকার
আজও নানুরে চণ্ডীদাসের স্মৃতিবিজড়িত স্থান, মেলা ও লোককথা মানুষের মুখে মুখে ফেরে। পর্যটক, গবেষক ও সাহিত্যপ্রেমীরা এখানে এসে অনুভব করেন এক গভীর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। যদিও ঐতিহাসিক তথ্য নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবু লোকবিশ্বাস ও সাহিত্যিক স্মৃতিই নানুরকে চণ্ডীদাস-রামীর প্রেমকথার কেন্দ্রস্থল করে তুলেছে।
রামী চণ্ডীদাস ও নানুর—এই তিনটি নাম একসঙ্গে উচ্চারিত হলেই ভেসে ওঠে প্রেম, বিদ্রোহ ও মানবতার এক চিরন্তন ছবি। সময় বদলালেও এই প্রেমকথা আজও সমাজকে প্রশ্ন করে—জাত, ধর্ম ও প্রথার ঊর্ধ্বে মানুষ কি আজও দাঁড়াতে পেরেছে? নানুরের মাটি যেন সেই প্রশ্নেরই নীরব সাক্ষী।